সবাই ডাকতেন ‘দেবদাস’, ব্যাংকার থেকে অভিনেতা হয়েছিলেন বুলবুল

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুধবার ৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০২৪ সকাল ১১:৩১:২৪

সবাই ডাকতেন ‘দেবদাস’, ব্যাংকার থেকে অভিনেতা হয়েছিলেন বুলবুল

Click Here

‘আমি তাঁকে ডাকতাম ভদ্র নায়ক বলে। শুধু আমি কেন, পুরো চলচ্চিত্রের মানুষই তাঁকে ভদ্র মানুষ বলে জানেন।’ ২০১০ সালে ১৫ জুলাই বুলবুল আহমেদের মৃত্যুর পর প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেন চিত্রনায়ক রাজ্জাক।
প্রকৃতির নিয়মে বুলবুল আহমেদ ও রাজ্জাক, কেউ এখন নেই। তাঁরা চলে গেছেন চিরদিনের মতো। মৃত্যুকে জয় করা যায় না, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে মৃত্যুই শেষ কথা নয়। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের কাজে, প্রিয়জন আর অনুসারীদের স্মৃতিতে। ফিরে আসেন বারবার। আজ ৪ সেপ্টেম্বর যেমন ফিরে এসেছেন বুলবুল আহমেদ। ১৯৪১ সালের এই দিনে তিনি প্রথমবার পৃথিবীর আলোতে এসেছেন।

বেদনামিশ্রিত ভালোবাসায় সন্তানেরা, অনুরাগীরা স্মরণ করছেন বুলবুল আহমেদকে। খবরের কাগজে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজ ফুটে উঠছে চিরচেনা বুলবুল আহমেদের মুখখানি। চশমা চোখে গোলগাল মুখখানি। কোনোটিতে স্মিত হাসি। যেন তিনি এখনো জাগতিক ভ্রমণের পথিক, হাঁটছেন নায়কের মতো। বাংলার নায়ক, যাকে বলা হতো ‘মহানায়ক’। সবাই ডাকতেন ‘দেবদাস’।
বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, সুদৃঢ়। উত্তমকুমার, দিলীপ কুমারের বেশ ভক্ত ছিলেন বুলবুল আহমেদ; তাঁদের আদলে চুলের ছাঁট দিতেন। ছোট থেকে বড় হওয়া অবধি এ স্টাইল অনুসরণ করেছেন। সাদা–কালো ‘দেবদাস’ যুগ পেরিয়ে রঙিন মহানায়ক চলচ্চিত্রের মতোই তিনি সময় থেকে সময়কে জয় করেছেন স্বমহিমায়। সুদর্শন নায়ক বলতে যে কয়জন সত্তর-আশির দশকে বাঙালি দর্শকের মন জয় করেছেন, তরুণীদের স্বপ্নের মানুষ হয়েছেন, তাঁদের অন্যতম বুলবুল আহমেদ।

বছর তিরিশেক আগের কথা। আশির দশকের শেষের দিকে। পুরান ঢাকার হাটখোলা রোডের এক বাসায় থাকতেন বুলবুল আহমেদ। ’৮৬ সাল থেকে এই এলাকায় সপরিবার তাঁর বাস। প্রায় দেখতাম তাঁকে। তখন তিনি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় নায়ক। অথচ কী সাধারণ জীবনযাপন! সেই সময়কার হাটখোলা এলাকার এক পানদোকানির সঙ্গে কথা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। বুলবুল আহমেদের প্রসঙ্গ আসতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সোহরাব হোসেন। বললেন, ‘আহা, দেবুদা! খুব একটা পানের অভ্যাস ছিল না, তবে আমার দোকান থেকে একটা পান খেতেন। সব সময় কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। কোনো দেমাগ ছিল না লোকটার।’
মনে পড়ে অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের কথা। তিনিও অনন্তকালের যাত্রী হয়েছেন। ২০১৯ সালে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল বুলবুল আহমেদ প্রসঙ্গে। ‘বুলবুল আহমেদ শুধু ভদ্রলোকই নন, একজন প্রকৃত মানুষ ছিলেন। এখন তো তাঁকে সরাসরি পাওয়া যাবে না, তাঁর সিনেমা দেখো।’ বলেছিলেন তিনি। সেবার এ টি এম শামসুজ্জামান পেয়েছিলেন বুলবুল আহমেদ স্মৃতি সম্মাননা পদক। সহশিল্পীর স্মরণে চোখে ছিল জল। বিটিভির আলোচিত নাটক ‘দক্ষিণের জানালা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’তে বুলবুল আহমেদের সহশিল্পী ডলি জহুর প্রথম আলোকে দেওয়া স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘বেশ পরিপাটি মানুষ ছিলেন বুলবুল ভাই। সাবলীল ভঙ্গিতে কথা বলেন। নিপাট ভদ্রলোক, কাজের ফাঁকে মজা করতেন, গল্প শোনাতেন।’

হওয়ার কথা ব্যাংকার
নিপাট ভদ্রলোকটির হওয়ার কথা ছিল ব্যাংকার। কাজ শুরুও করেছিলেন ব্যাংক–জগতে। সে গল্প জানার আগে আরেকবার শুনে আসি তাঁর বুলবুল আহমেদ হয়ে ওঠার গল্পটা।

১৯৪১ সালে পুরান ঢাকার আগামসিহ লেনে বুলবুল আহমেদের জন্ম। এক ভাই ও ছয় বোনের পর তাঁর জন্ম। ভালো নাম রেখেছিলেন তাবারক আহমেদ। মা–বাবার বড় আদরের সন্তান। তাই মা–বাবা আদর করে ডাকতেন ‘বুলবুল’।
বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সংস্কৃতিমনা ছিলেন। বাড়িতেই নাটকের মহড়া করতেন। বাবা খলিল আহমেদ একই সঙ্গে নাটকে অভিনয় করতেন এবং নির্দেশনা দিতেন। আড়াল থেকে, কখনো জানালা, কখনোবা দরজার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এই মহড়া দেখতেন ছোট ছেলে বুলবুল আহমেদ। এই আসর থেকেই তিনি অভিনয়ের অনুপ্রেরণা পান। এই মহড়ার সুবাদে অনেক নামীদামি শিল্পীকে তিনি তাঁদের বাড়িতে আসতে দেখেছেন, যাঁদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কাজী খালেক, মহম্মদ আনিস, আয়েশা আক্তার, রানী সরকার, নারায়ণ চক্রবর্তীর নাম শোনা যায়।

পুরান ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় ছিল মাহবুব আলী ইনস্টিটিউশন, যেখানে খলিল আহমেদের নাটক মঞ্চস্থ হতো। বুলবুল আহমেদ এই নাটকগুলো দেখতে যেতেন সব সময়। বুলবুল আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় অভিনেতা হব, এটা ভাবিনি, কিন্তু আমার মনে হয়, এসব বিষয় আমার অবচেতন মনে গভীর ছাপ ফেলে। এর ফলেই পরবর্তীতে অভিনেতা হিসেবে আমার পদচারণ। আমি মনে করি, জন্মগত প্রতিভা না থাকলে অভিনেতা হওয়া যায় না। অনুকূল পরিবেশ ও পারিবারিক পরিমণ্ডলও অবশ্যই প্রভাব ফেলে।’

একসময় ঢাকায় কয়েকজন বন্ধু মিলে ‘শ্যামলী শিল্পী সংঘ’ নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী গঠন করেন। নীহাররঞ্জন গুপ্তর ‘উল্কা’ নাটকটি মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে এই সংঘের যাত্রা শুরু হয়।

এই বিখ্যাত নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে, যেখানে বুলবুল আহমেদ ‘সুবীর’ চরিত্রে অভিনয় করেন। বুলবুল আহমেদ ছাড়াও সে সময় এই নাট্যগোষ্ঠীর হাত ধরে গৌরবের স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ আহসান আলী সিডনী, আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, নাজমুল হুদা বাচ্চু, কেরামত মওলা প্রমুখ। নাজমুল হুদা বাচ্চু ও আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম—এই দুজন প্রথিতযশা শিক্ষাগুরুর কাছে গভীর নিমগ্নতায় ডুবে থেকে একটু একটু করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন বুলবুল আহমেদ। অভিনয়ের আকুলতা নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন মঞ্চ থেকে মঞ্চে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে, ঢাকা কলেজ থেকে এমসি কলেজ—সর্বত্র। একপর্যায়ে ষাটের দশকের সাড়াজাগানো নাট্যদল ‘ড্রামা সার্কেল’-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অভিনয়ের দক্ষতা আরও প্রসারিত হয় ‘ইডিপাস’ ও ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’ নাটক দুটির মধ্য দিয়ে।
লেখাপড়ায় বরাবরই সচেতন ছিলেন বুলবুল আহমেদ। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর করে ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন। মাঝের কিছুদিন সিলেট এমসি কলেজেও পড়াশোনা করেছেন। জানা যায়, সিলেট এমসি কলেজে থাকাকালে মঞ্চনাটক ‘চিরকুমার সভা’য় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অভিনয় করে উপস্থিত সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন তিনি। ব্যাংকের শাখাপ্রধান হিসেবে চাকরি করেন টানা ১০ বছর।

সর্বশেষ খবর

সর্বাধিক পঠিত